Saturday, April 25, 2020

-: সোনা রিত্রী :-


রিত্রী দিবসের আজ সুবর্ণ জয়ন্তী। না! এই দিবসটার সাথে আমরা তেমন পরিচিত নই। ২২ এপ্রিল, ১৯৭০ সালে প্রথম বারের মত দুশো লক্ষেরও বেশী আমেরিকার আম-আদমি সেখানকার শতাধিক শহর জুড়ে প্রথম বারের মত এই দিনটি পালন করেন। উদ্দেশ্য ছিল, ‘পরিবেশ-অজ্ঞতা’-র বিরুদ্ধে সর্বত্র প্রতিবাদ করা। কবি সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতার মত, ‘ বিশ্বকে  শিশুর বাসযোগ্য রে যাব আমি নবজাতকের কাছে  আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’ গোছের একটা দৃঢ় প্রত্যয়ও অবশ্য সেখানে মনে মনে কাজ করছিল
সেই অর্থে এ বছর পঞ্চাশতম ধরিত্রী দিবস। এবছরের ধরিত্রী দিবসের বিষয়(Theme) হচ্ছে, ‘ক্লাইমেট একশন’(Climate action), অর্থাৎ, গোটা মানব জাতি, এবং তাদের জীবন  ধারনের পদ্ধতি (Life Support System) যাতে ভবিষ্যত দিনে মানুষ তথা সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের  অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দীর্ঘস্থায়ী রূপে অনুকুল পরিস্থিতি করে রাখা যায়; যাতে করে এদের কেউই বিলুপ্তির মুখ না দেখে, সেইমত কাজ করে যাওয়া। এর জন্য যেটা অতি আবশ্যক, তা হচ্ছে, ব্যক্তিস্তরে (এবং সমষ্টিগত ভাবে) কার্বন ফুটপ্রিন্ট ন্যুনতম মাত্রায় কমিয়ে আনা। বলা বাহুল্য, এক এক জনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট নির্ধারিত হয় তিনি কি রকম জীবন যাপন করছেন, কি ধরনের গাড়ী দিয়ে অফিস যাতায়াত করেন, কতটুকু দূর গাড়ী নিয়ে রোজ পাড়ি দিচ্ছেন, দিনে গড়পড়তা কতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, যে খাবারটা খাচ্ছেন, সেটা কোথায় এবং কিভাবে বানানো হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ, এককথায়, ব্যক্তি জীবনের ক্ষেত্রে প্রতি এক জনের জন্য কতটুকু কার্বন পৃথিবীর বুকে এসে জমা হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, কার্বন ফুটপ্রিন্টের আজকের দিনে গড়পড়তা মাথাপিছু (Global average) হলো প্রায় ৪ টন এবং শুধুমাত্র আমেরিকাবাসীদের জন্য এই মাত্রা ১৬ টন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০৫০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি যদি ২ ডিগ্রী  সেন্টিগ্রেড দমিয়ে রাখতে হয়, তার জন্য  বিশ্বজুড়ে মাথাপিছু এই কার্বন ফুটপ্রিন্টের মাত্রা ২-টনের নিচে নিয়ে আসাটা  নিতান্তই জরুরি। কি ভাবছেন?
বার তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, তার জন্য  ধরিত্রী দিবসের এই সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে গৃহবন্দী অধিকাংশ বিশ্ববাসীর, সঙ্গে ভারতবাসীরাও কি করবে? এই লক ডাউনে? আচ্ছা, এটা তো আর এক দিবসীয় কর্মসূচী নয়, যে এইদিনটাতেই শুধু করতে হবে। অন্তত পক্ষে, আমাদের চেতনার উন্মেষ (Conciousness)-টাকে আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রচলিত লক ডাউন কোনও ভাবেই পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াতে পারে না!
বিজ্ঞজনেরা বলেন, শিক্ষা না কি দু’রকমের হয়, এক দেখে শেখা, আরেকটা, ঠেকে শেখা! তারই রেশ ধরে বলছি, ভাবেই হোক, কিম্বা ভাবলেশ মতেই হোক, এবছর আমরা, মানে শুধু উপত্যকাবাসী নয়, বরং স্বীকার করে নেওয়া উচিত, সমগ্র ভারতবাসী, নির্ধারিত এই দিনের (অর্থাৎ ২২ এপ্রিলের) আঠাশ দিনে আগে থেকেই ধরিত্রী দিবস নামক চল্লিশ দিবসীয় ব্রতকথা পালন করতে উদ্যত হয়েছি, এবং মজার খবর এই যে, নির্ধারিত এই দিনের পরও আরো এগারো দিন আমরা তা পালন করব। কি অপূর্ব সমাপতন! বলছিলাম, যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে এই ‘চল্লিশার দশা’ কাটাতে হচ্ছে, তাতে করে একাংশ লোকের কম বেশী হলেও এতদিনে সম্বিৎ ফিরেছে, এবং ফিরছেও। এখন দেখার কথা, চেতনার এই উন্মেষ–টুকুর কত খানি প্রতিফলন হয়, ব্যক্তি তথা সামূহিক জীবনের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে!
চ্ছা, একবার ভাবুন তো, বিলাসবহুল জীবন যাপনে লিপ্ত আত্মঘাতী মানবকুল এই পৃথিবীর উপর নিরন্তর এবং উপর্যুপরি অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে কি না? গোটা বিশ্ব তথা দেশের কথা ছাড়ুন। যদি আমাদের এই উত্তর পূর্বাঞ্চল, তথা অসম রাজ্য, এমন কি এই বরাক উপত্যকার প্রসঙ্গে কথাগুলো তোলা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সারা বিশ্ব তথা দেশের তুলনায় আমরা কোনো অংশে পিছিয়ে নেই!
সুখের ক্ষেত্রে যেমন কিছু কিছু অসুখ রয়েছে যাদেরকে ‘লাইফ স্টাইল রিলেটেড ডিসিজ’ (Life style related disease) বলা হয় (যেমন, হার্ট এটাক, স্ট্রোক, লিভার পচে যাওয়া ইত্যাদি), ঠিক তেমনি আমাদের দৈনন্দিন জীবন কাটানোর পদ্ধতির উপরও পরিবেশের অসুখ হওয়াটা অনেক খানি নির্ভর করে বৈকি!  আচ্ছা, দশ টাকার ঐ জলের বোতলের ব্যবহার কি সামান্য একটুখানি চেষ্টা করলেই আমরা বাদ দিতে পারি না? ঠিক একই ভাবে ঐ পলিইথিলিন জাতীয় একবার ব্যবহৃত প্লাস্টিক? শহরাঞ্চল বলুন, কিম্বা গ্রামের। নালা- নর্দমা সর্বত্রই যে এরা জলের মুক্ত ধারাকে ব্যাহত করছে! আবার অতি শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত কিম্বা অশিক্ষিত ফ্লাট-বাড়ির মালিক কিম্বা গ্রামের গৃহস্তের কথাই বলুন। বাড়ির সামনে রাস্তায় কিম্বা নালায় ধুম করে রোজকার শাক-সব্জির খোসার আবর্জনা পোটলা বেঁধে বাইরে ফেলে তো বাড়ির ভেতরের চৌহদটা পরিস্কার রাখেন। একটিবারের জন্য তাদের ভাববার অবকাশ নেই, এই ফেলে দেওয়া আবর্জনার শেষ গন্তব্যস্থলটা কৈ? এই আবর্জনা মানে শাক-সব্জির খোসা থেকে যে সম্পদ (Waste to Wealth) বানানো সম্ভব, সেটা কে কাকে বোঝায়?
বেশ ঘটা করে গেলো বছরের রাজ্যিক স্তরে পরিবেশ দিবস তো এই বরাক উপত্যকায় হয়েছিল। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী (৫ই জুন, ২০১৯ইং) শিলচরের পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ডে দেওয়া ভাষণে প্রত্যেক রাজ্যবাসীকে ‘দুটো-হাতে দুটো-গাছ’ লাগানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। উনার বক্তব্য মাথায় রেখে, এপক্ষ এবং ওপক্ষের বরাকবাসী (এবং রাজ্যবাসী) মাথাপিছু এখন অব্দি কটা গাছ লাগিয়েছেন, তার কি কোনও তথ্য পাওয়া যাবে?
বেশ কয়েক মাস আগের কথা বলছি। এক ছাত্র মারফৎ এ জেলারই জয়পুর-রাজাবাজার এলাকা থেকে মুঠোফোনে একটা স্ক্রীন-শট ফোটো পেয়েছিলাম।  অজগরকে একটাকে মেরে তার লেজটা উঁচু গাছে বেঁধে রেখে (অনেকটা পাঁঠা ছোলানোর মত) মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে চামড়াটা ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছিল, এবং সদর্পে সেটা জনৈক সেই ব্যক্তি হোয়াটসএপ-এ স্টেটাস দিয়ে রেখেছিলেন।
রকম পথচলতি জীবনে অনেক অভিজ্ঞতারই সঞ্চয় হয়। সেরকম আরেকটা ঘটনার কথা বলছি। মাস কয়েক আগে একটা ইনোভা গাড়ি দিয়ে মিজোরাম বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার পথে গাড়িচালকের কাছ থেকে শোনা। তবে ঘটনা যে মিথ্যা নয় তার প্রমান পরবর্তীকালে পেয়েছি। গাড়িচালক বলছিলেন, ঐ গাড়িটা নাকি খোয়া গেছিল, অনেকদিন এর হদিশ পাওয়া যায় নি, শেষ মেশ হায়দ্রাবাদের এক দামি হোটেলের বেইসমেন্ট ফ্লোর থেকে উদ্ধার হয়েছে। মিজোরাম যাওয়ার পথে গাড়িটা যিনি চালাচ্ছিলেন, তিনি গাড়ির মালিক। বলছিলেন, এর আগে গাড়িটা ড্রাইভারই চালাতো। শহরের এক ব্যবসায়ী (বরং সোজা-সাপটাই বলি, তক্ষক চোরাপাচারে লিপ্ত অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ী; শহরের কোন এলাকা, সেটা আপাততঃ উহ্য থাকলো) শিলচর থেকে এই গাড়িটা করে সোজাসোজি হায়দ্রাবাদ পাড়ি দেন। ইনোভা গাড়িটা চুরি, পরবর্তীতে এর উদ্ধারের উপাখ্যান, এবং গাড়ী উদ্ধারে পুলিশের সহায়তা এই নিবন্ধের প্রাসঙ্গিকতার মধ্যে পড়ছে না, সেটা না হয় অন্য পরিসরে বলা যাবে)। কিন্তু একটা ঘটনা তো স্ফটিকের মত পরিষ্কার, যে  চোরাই পথে বন্যপ্রাণী পাচারের ঘটনায় আমাদের বরাক উপত্যকা দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই!
স্ফটিকের মত স্বচ্ছ আরেকটা ঘটনা আপনাদের স্মৃতির অতলে এখনও তলিয়ে যায় নি! বরাক উপত্যকার তিন জেলা নিয়ে যে বৃত্ত, তার চারপাশের পাঁচশো-হাজার কিলোমিটার দূরত্বে দেশীয় ভূখণ্ডের  কোথাও পোস্ত-চাষ হয় বলে জানা নেই!  (জানিনা আপনাদের জানা আছে কি না!) তাহলে দ্বীপান্বিতার পর পরই শহরে ঐ পোস্তর গাড়ি এসেছিলো কোথা থেকে? যাচ্ছিলই বা কোথায়? না, কেউ জানলাম না! অনুসন্ধিৎসু মন উত্তরের অপেক্ষায় থেকেই গেলো! অদূর ভবিষ্যতে সাংবাদিক বন্ধুদের  কেউ হয়ত এ নিয়ে তদন্তমূলক প্রতিবেদন উপত্যকার কোনও খবরের কাগজে  প্রকাশ করবেন, সেই আশায়ই রয়েছি ! আচ্ছা, একটা কথা তো ঠিক, অবৈধ ঐ পোস্তর গাড়ি না আসলে বেঘোরে মেহেরপুরের দুটি মেয়ের প্রান যেত না! জানি না এর আগেপরে এক বা একাধিক পোস্তর গাড়ি সে পথ মাড়িয়েছে কি না! তবে মন্দের ভালো এই যে, সেগুলো ক্ষেত্রে  অন্য কোনও (সা/না) বালক - (সা/না) বালিকা কিম্বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধার প্রান হানি হয় নি!
ভাবছেন, ধান ভানতে শিবের গীত! কোথায় ধরিত্রী দিবস, আর কোথায় পোস্ত- উপাখ্যান! মিল আছে বৈ কি? ঐ যে শিরোনামে বলা আছে,  সোনার ধরিত্রী; একটু শ্লেষাত্মক ঠেকবে, তবুও বলতে ইচ্ছে করছে, সুবর্ণ জয়ন্তীতে, অর্থাৎ পঞ্চাশে, ধরিত্রীর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি! আর ধরিত্রীর এই পঞ্চত্ব প্রাপ্তিতে আমাদের ‘আপনি বাচলে…’ গোছের শরণার্থীসুলভ জীবন-দর্শন, চোখ এবং উদরের অন্তহীন ক্ষুধা ইত্যাদি অনবরতঃ যোগান দিয়েই চলেছে! যতদিন পর্যন্ত ‘ভাবের ঘরে এই চুরি’-খানা বজায় থাকবে, ততদিন ধরিত্রী বলুন, বা প্রকৃতি... সেটার রক্ষনাবেক্ষনে খামতি থেকেই যাবে! অবধারিত ভাবে যেটা প্রয়োজন, তা হচ্ছে, আমাদের মনন জগতের আমূল পরিবর্তনের।  সকলের সাথে, সবাইকে নিয়ে বাঁচার তাগিদে সেটা তো করতেই হবে। এবার একটু নির্জনে বসে নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করুন দেখি, এই ত্রুটিপূর্ণ জীবন-দর্শন পাল্টানো কি সম্ভব?  ‘দেশ কি ধরতি’ মাতা আপনাদের সেই উত্তরের অপেক্ষায়ই রয়েছেন। সামগ্রিকভাবে সেটা যদি করা সম্ভব হয়, তাহলেই হয়তঃ বা ধরিত্রী মাতার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি আটকানো সম্ভব। 
তুবা...??
 -পার্থঙ্কর চৌধুরী

(অধ্যাপক, বাস্তু ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর)

Saturday, April 18, 2020


পৃথিবী-জুড়ে কান্না : এই কি তবে ‘দেবতার গ্রাস’?


বড়ই দুঃসময়! পৃথিবী আজ না সারা এক ব্যমোতে ভুগছে। না! হয়তঃ বা একটু ভুল বলে ফেললাম! অসুখটা সম্ভবতঃ পৃথিবীর না। জৈবিক আর জীবের অজৈব রসদ, বাস্তু-তন্ত্রের হরেক খুঁটিনাটি উপাদান, এরা কেউই জরাগ্রস্ত নয়। অসুস্থ হয় যায় নি দিন-রাতের নির্ঘণ্ট;  অমাবস্যা-পূর্ণিমার চক্র, কিম্বা আহ্নিক অথবা বার্ষিক গতির সময় সূচি! তাহলে? কিসের এত গেলো গেলো রব?

গেছে তো ঠিকই! তবে পৃথিবীর বুকে থাকা ৭০ লক্ষেরও বেশী প্রজাতির মধ্যে ৬৯ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৯৯টি প্রজাতির মধ্যে কোনও হাহাকার নেই! গেলো গেলো করছে শুধু ‘হোমো-সেপিয়েন্স’ নামক প্রজাতিটি। তাও আবার গোটা বিশ্ব জুড়ে এদের একই রকম দুর্যোগ! 

দুর্যোগ মানেই তো বিপর্যয়! নানান অসুবিধা এই বিপর্যয় তো এক এক সময় এক এক চেহারা নিয়ে হাজির হয় ছিয়াত্তরের মনন্ত্বর, (১১৭৬ বাং/ ১৭৭০ ইং)-এর কথা মনে আছে তো ?  একটানা তিন সাল ধরে চলে আসা ঐ দুর্ভিক্ষে সেই সময় এক কোটিরও বেশী লোক মারা যান। জন ফিস্ক তার ‘দ্য আনসিন ওয়ারল্ড’ বইটিতে লিখেছেন, বাংলার এই দুর্ভিক্ষ চতুর্দশ শতকের ইউরোপের ঘাতক বেবুনিক প্লেগের চেয়েও কয়েক গুন বেশী মারাত্মক। আবার বিভূতিভূষণের বর্ণনায় পঞ্চাশের মনন্ত্বর (১৯৪৩ ইং) বাংলার মহামারী তো কালজয়ী ‘অশনি সঙ্কেত’! পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অতীতে হয়ে আসা বিভিন্ন মহামারী (স্প্যানিশ ফ্লু , ইঁদুর বাহিত দ্য প্লেগ অফ জাস্টিশিয়ান, ই-বোলা ইত্যাদি যেন এক একটা  মূর্তিমান আতঙ্ক !

বিপর্যয় আর জরুরি (Disaster and Emergency) অবস্থার মধ্যে ফারাক এটাই যে, জরুরিকালীন পরিস্থিতিতে অন্যরা সাহায্যের জন্যও এগিয়ে আসে, কিন্তু যেহেতু বিপর্যয়’ সবার জন্য একসাথেই আসে, একসঙ্গেই সবাইকে কাবু করে, অতএব, সদিচ্ছা স্বত্বেও অন্য কেউ তেমন কিছু করে উঠতে পারে না আরেকটু খোলসা করে  বলছি, ধরুন পাড়াতে কারো বাড়িতে আগুন লাগলো (বা বগিচ্যুত হয়ে ট্রেনের বেশকিছু লোক মারা গেলেন), সেটাজরুরি পরিস্থিতি’, কিন্তু, বর্তমান মহামারী নিশ্চিত ভাবেই বিপর্যয় এটা কোনও একটা প্রান্ত বা শুধুমাত্র এক দেশের জন্য নয়। গোটা বিশ্ব জুড়ে। বিপর্যয়ের তালিকায় আরও রয়েছে কেমিক্যাল এবং বায়োলোজিকাল বিপর্যয় আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে কখনো নেমে আসে বন্যা, কখনো খরা! আবার কখনো,  ভূমিকম্প, ভুমিস্খলন কিম্বা সুনামি; আবার কখনো প্রবল বেগে ঝড় 

এক একটা বিপর্যয় যে একসাথে কত লোকের প্রান কেড়ে নেবে, তার আগাম ঠাহর করা বড়ই দুস্কর! ধরা যাক ঝড় বা কালবৈশাখীর কথাই। আমরা যাকে ‘সাইক্লোন’ বলি,, সেই সর্বনাশী তুফান পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। উত্তর আটলান্টিক এবং উত্তর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় ‘হ্যারিকেন’; উত্তর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চিন মহাসাগর এলাকায় ‘টাইফুন’নাম যাই হোক, বিধ্বংসী তাণ্ডবলীলা চালানোর ক্ষেত্রে সবার চরিত্র একই। যে পরিসংখ্যানটা  হাতে রয়েছে, তাতে দেখা যায়, গত তিন শতাব্দীর মধ্যে তুফান, হারিকেন বা টাইফুন গোটা পঁচিশেক বিধ্বংসী তাণ্ডবলীলা  চালিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, এবং এগুলোর প্রত্যেকটাতেই ন্যুনতম দশ হাজার থেকে তিন লক্ষেরও বেশী লোকের প্রান  গেছে। স্বল্প পরিসরে যদি কয়েকটার উল্লেখ করি, তাহলে বলতে হয়, ১৭৩৭ সালের কোলকাতার হুগলীর তুফান (মৃতের সংখ্যা ৩,০০,০০০); ১৮৭৬ সালে বাংলাদেশ (বাকেরগঞ্জ) (মৃতের সংখ্যা ২,৫০,০০০);  ১৮৮১ সালে চীনদেশে (মৃতের সংখ্যা ৩,০০,০০০); ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে (মৃতের সংখ্যা ৩,০০,০০০); ১৮৯৭ সালে বাংলাদেশে (মৃতের সংখ্যা, ১,৭৫,০০০), আবার ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে (মৃতের সংখ্যা ১,৩৮,০০০)এ ছাড়াও কুড়ি থেকে ত্রিশ কম্বা পঞ্চাশ হাজার লোক মারা গেছেন, এমন ঘটনা আরও ১২-১৫টা রয়েছে। (তথ্যসুত্রঃ C R C Report, Indian Meteorological Department Publication)  করোনায় মৃতের সংখ্যা (এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত) এক লক্ষ পয়ত্রিশ হাজারের সামান্য বেশী হলেও,  মন্দের ভাল এটাই যে মহামারী সুলভ ভয়ানক সংক্রমণের দিকটা আর পাঁচটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে থাকে না।

আবার ভুমিকম্প, যেটা কি না  বিপর্যয়ের অন্য আরেক নাম, তার পরিসংখ্যানটাও ভীষণ উদ্বেগের। যদিও প্রত্যেকদিন পৃথিবীর কোনও না কোনও প্রান্তে নিরন্তর মৃদু বা হালকা ভূমিকম্প হয়েই চলেছে, যেহেতু সেগুলো অনুভূতির মধ্যে আসে না, তাই প্রায়শঃ বোধগম্যই হয় না! লোকেরা উলুধ্বনি, কাঁসরঘণ্টা বাজিয়ে হুড়মুড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি তখনই, যখন এর মাত্রা ৪ - ৫ কিম্বা তার থেকে বেশী হয়। উত্তর পূর্বাঞ্চল (বাংলাদেশ এবং নেপাল কে  ধরেই বলছি) তো প্রচণ্ড ভাবে ভূমিকম্প প্রবন এলাকা। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, জাপানের পর আমাদের এটাই দ্বিতীয় স্থান, যেখানে ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়! অতীতে এই এলাকায়  বড় মাপের (রিখটার স্কেলে ৭ বা  তারও বেশী) ভুমিকম্পের কথা উল্লেখ করলে বললে হয়, কাছাড়ে ২১ মার্চ, ১৮৬৯ হওয়া (৭.৮ মাত্রা), শিলঙে ১২ জানুয়ারি, ১৮৯৭ (৮.৭ মাত্রা), শিবসাগর, ৩১ আগস্ট, ১৯০৬ (৭.০ মাত্রা), শ্রীমঙ্গল, বাংলাদেশ ৮ই জুলাই, ১৯১৮ (৭.৬ মাত্রা), দক্ষিণ পশ্চিম আসাম, ৯ই সেপ্টেম্বর, ১৯২৩ (৭.১ মাত্রা), আপার আসাম, ২৭ জানুয়ারি, ১৯৩১ (৭.৬ মাত্রা), অরুণাচল প্রদেশ, ৭ই জুলাই, ১৯৪৭ (৭.৫ মাত্রা), ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, ১৫ আগস্ট, ১৯৫০ (৮.৭ মাত্রা), কাঠমান্ডু, নেপাল, ২৫ এপ্রিল, ২০১৫ (৭.৮ মাত্রা)। এছাড়াও ৭-৮ মাত্রার মধ্যে আরও  ন্যুনতম দশটি ভূমিকম্প হয়েছে, যেগুলোর বিশদ উল্লেখ  এখানে আর করলাম না। এগুলোর প্রত্যেকটিতেই জান-মালের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্মরনাতীত কালের মধ্যে নেপালের ২০১৫ সালের ভুমিকম্পের বিভীষিকা কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মন থেকে মুছে যায় নি!

সুনামি! জাপানি এই শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে, ‘বন্দরের ঢেউ’২০০৪-এ ভারত মহাসাগরের এই সামুদ্রিক ঢেউয়ের কথা অনেকের কম বেশী মনে থাকলেও তার আগেরগুলির হদিশ অনেকেরই অজানা। ১৮৮৩ সালের আগস্টে ভারত মহাসাগরের বুকে ক্রাকাটুয়া নামক দ্বীপে ভয়ংকর আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের ফলে যে সুনামি হয়েছিল, তাতে সমুদ্রে জলের ঢেউগুলো ৩৫ মিটার  উঁচু পর্যন্ত উঠেছিল।  ঐ সুনামিতে ইন্দোনেশিয়া, জাভা এবং সুমাত্রার প্রায় ৩৭,০০০ লোক একদিনে প্রান হারিয়েছেন। গত ৩০০ বছরে ভারত মহাসাগর উপকুলে  ছট-বড় মোট ১৩টা সুনামি হয়েছে এবং তার তিনটিই আন্দামান-নিকোবর দ্বীপ সমুহের আশপাশ অঞ্চলে। ভারত উপমহাদেশের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সুনামি র ফলে যেগুলো দেশের ক্ষতি হতে পারে, তাদের মধ্যে রয়েছে, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড,  শ্রীলঙ্কা, পাকিস্থান, ইরান, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, মালদ্বীপ, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, কেনিয়া, মাদাগাস্কার, মরিশাস, ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়া।  ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের বুকে হয়ে যাওয়া ঐ সামুদ্রিক ঢেউয়ের দেশের প্রায় ১১ হাজার লোক মারা গেছিলেনপাশের সব দেশ মিলিয়ে ২,৩৮,০০০ লোক কম বেশী  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, এদের মধ্যে ৫২,০০০ জন নিরুদ্দেশ এবং মোট চোদ্দটা দেশের ১৫০ লক্ষ লোক অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছিলভয়ানক বিভীষিকাময় ঐ সুনামির ছাপ আজকের দিনেও আন্দামানে দ্বীপ সমুহে বেড়াতে গেলে চোখে পড়ে।

একুশ দিনের লক-ডাউনের প্রথম সপ্তাহেই একটি ভুয়ো খবর হোয়াটস-এপ মারফৎ প্রত্যেকের মুঠোফোনে পৌঁছে গেছিল। বলা হচ্ছিল, সেদিনের রাত ১২টা থেকে ‘ডিসেস্টার ম্যানেজমেন্ট এক্ট’ চালু হবে। একটু সময়ের জন্য ভিমড়ি খেতে হয়েছিল বৈ কি!   জ্ঞান বিশ্বাস এবং  হিসেব মত তো ঐ আইনটা ২৩ ডিসেম্বর, ২০০৫ থেকেই লাগু। আবার এটা কার্ফু বা ১৪৪ ধারার মতোও নয়, যে পরিস্থিতি বুঝে লাগু করা যায়, আবার যখন তখন তুলে নেওয়া যায়! তাহলে?

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আইনে ‘দুর্যোগ মোকাবিলা’কে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের স্থায়ী নীতি হিসেবে গ্রহন করার উল্লেখ রয়েছে। মহিলা, বয়স্ক লোকেরা, শিশু এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী লোকেদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার কথাও ঐ আইনে উল্লেখ রয়েছে। তবে  এদেশে বর্তমানে প্রচলিত সংরক্ষণের আদলে কোনও জাতি, সম্প্রদায় ইত্যাদির জন্য বাড়তি কোনও সুবিধার কথা উল্লেখ নেই। আইনে আরও বলা রয়েছে, যে দুর্যোগ মোকাবিলায় যেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট সেক্টর ইত্যাদি সবাই  সমান ভাবে দ্বায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আইন মতে প্রত্যেকটা রাজ্যের মুখ্য মন্ত্রীর নেতৃত্বে স্টেট ডিজেস্টার মানেজমেন্ট অথোরিটি (SDMA) থাকার উল্লেখ রয়েছে, যার অধীনে জেলাগুলোতে ডিসট্রিক্ট ডিজেস্টার মানেজমেন্ট অথোরিটি (DDMA) থাকবে। জেলার জেলাধিপতি মহকুমাধিপতিদের নিয়ে জেলা ভিত্তিক বিশেষ বিশেষ দুর্যোগপ্রবন এলাকাগুলি চিহ্নিত করবেন। এক কথায়, এই আইনে ‘বটম-টু-টপ’ নীতিই প্রাধান্য পায়।

দুর্যোগ মোকাবিলার এই আইন জাতীয় স্তরে ন্যাশনাল ডিজেস্টার রেসপন্স ফোরস (NDRF) এবং রাজ্য স্তরে রাজ্যিক ডিজেস্টার রেসপন্স ফোরস STATE DISASTER RESPONSE FORCE (SDRF) গঠন করার কথাও উল্লেখ রয়েছে, এবং কেন্দ্রস্তরে থাকা NDRF, প্রত্যেকটা রাজ্যের মধ্যে সংযোগ বজায় রেখে কাজ করে। এই NDRF, সেনা বাহিনী, পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী, দমকল বাহিনী, হোম গার্ড, এবং সর্বোপরি রাজ্যিক ডিজেস্টার রেসপন্স ফোরসের সদস্যদের প্রশিক্ষন দেবে, প্রয়োজন মোতাবেক। তা হবে অবসর সময়ে। সেই মতে, গোটা দেশে ন্যাশনাল ডিজেস্টার রেসপন্স ফোরসের সাতটি প্রধান শাখা রয়েছে, যার একটি  রয়েছে অসমে, উত্তর পূর্বের সব রাজ্যের জন্য।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এই আইনে চার স্তরীয় দুর্যোগ মোকাবিলা চক্রের (Disaster Management Cycle) কথাও উল্লেখ রয়েছে। এগুলো হল প্রশমন (Mitigation),  প্রস্তুতি বা উদ্যতি (Preparedness),  প্রতিক্রিয়া (Response) এবং পুনরুদ্ধার বা আরোগ্য (Recovery)। দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য এই চারটি পর্যায়ের কথা সব সময় খেয়াল রাখা হয়। কোথাও ধরুন একটা শপিংমল বা সিনেমা হল বানানো হবে, তা সেখানে সিড়িগুলো বা লিফট কোথায় কোথায় হবে, ক’টা হবে, সেটা ‘প্রশমনের’ পর্যায়ে পড়ে। আবার  ভুমিকম্প হলে হটাৎ করে সেই মলে পদপৃষ্ট এড়াতে  যে পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটা হচ্ছে ‘প্রস্তুতি’; পদপৃষ্ট  হয়ে লোকের মৃত্যু এড়ানোর ব্যাপারে যথাযথ প্রশিক্ষনের বিধান রয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে কি ভাবে কি করা, সেটা ‘প্রতিক্রিয়া’ এবং ধরুন পদপৃষ্ট হয়ে বেশ কয়জন আহত হয়েই গেলেন, সে ক্ষেত্রে যেটা করা হয়, তা ‘আরোগ্য’ পর্যায়ের।

আচ্ছা, এতোসব তাত্বিক কথা ছাড়ুন।  বলছিলাম, একজেদি ঐ রাখাল ছেলেটার কথা মনে আছে তো ? আর মোক্ষদা?  হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, কথাগুলো ‘দেবতার গ্রাস’ প্রসঙ্গেনাছোড়বান্দা রাখাল যখন কোনও ভাবেই ঘরে থাকতে রাজি হচ্ছিল না, তখন প্রচণ্ড ক্রোধে (নিতান্ত অনিচ্ছাস্বত্বে যদিও) মায়ের মুখ থেকে ঐ ‘চল তরে দিয়ে আসি, সাগরের জলে’  কথাটা বেরিয়ে এসেছিলো কি না? কবিতাটার শেষের দিকের ঘটনাক্রমও নিশ্চয় মনে আছে। কোনও শক্তিই ‘রাখাল-বালক’ কে রক্ষা করতে পারলো না সাথে করে, জলে ঝাঁপ দিয়ে  ব্রাহ্মণেরও (প্রতীকী অর্থে এখানে ডাক্তার) জীবন শেষমোক্ষদা বলুন, কিম্বা বলুন ‘ধরিত্রী’! দুজনই তো মা। ইংরেজিতে আমরা তো ‘মাদার আর্থ’ বলি।  একগুয়েমি, জেদাজেদি, নিজেদের স্বার্থলোলুপতা মানুষ ( নিবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করা ‘হোমো-সেপিয়েন্স’) নামক ‘রাখাল’-দেরকে কোথায় পর্যবসিত করছে, সেটা ভাববার সময় কি এখনও বাকি? দেশের বাবা (Mahatma Gandhi) তো কবেই বলেছিলেন, ‘The world has enough for everyone’s needs, but not everyone’s greed.’। বাবার কথাগুলো ছেলে-মেয়েরা পালন করছে কৈ? আজকালের ছেলে-মেয়েরা সত্যিই, বড় বেশী বেপরোয়া !

সাংখ্যতত্ত্বে বর্ণিত ঐ ‘দ্বৈতবাদী দর্শন (Dualistic Philosophy)-র কথা মনে আছে তো? প্রকৃতি বলুন বা ‘নেচার, সে তো তার নিজস্ব খেয়াল-খুশি মত চলবে, এটাই তো স্বাভাবিক। প্রকৃতির ঐ ‘বিধির বাধন’ কাটতে পারো, হোমো-সেপিয়েন্স, তুমি কি এমন শক্তিমান? (আবার বলছি), হোমো-সেপিয়েন্স, তুমি কি এমনি শক্তিমান??

Monday, April 6, 2020




পরিবেশের  পাঁচমিশেলি
                                   

(১) রাজস্থানের চিঠি

ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের পাথারিয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কমতে কমতে বর্তমানে পাঁচটি হাতি রয়েছে এদের সব কটিই স্ত্রী অনেকের হয়তঃ বা মনে আছে, সেটা ১৯৮৩ কিম্বা ৮৪ সাল হবে। দামাল হাতির একটি দল কাছাড়ের কুম্ভা, কুম্ভিরগ্রাম বাগান থেকে থাইলু, বড়থল ইত্যাদি হয়ে দেওয়ান চা বাগান পর্যন্ত গেছিল।  স্ত্রী-পুরুষ-বাচ্চা মিলিয়ে আনুমানিক ৪০-৪৫ টি হাতি ছিল ঐ দলে। পরবর্তীতে এই বিশাল হাতির দলটি কোথায় গেলো, তার হিসেব আমরা কেউ রাখি নি!
গোটা বরাক উপত্যকায় এদের সংখ্যা কমে গিয়ে বর্তমানে পাঁচটিতে এসে দাঁড়িয়েছে।  ব্যক্তিগত মালিকানায় থানা গোটা কয়েক হাতি বাদ দিলে উপত্যকায় থাকা বন্য হাতির সংখ্যা এই পাঁচটিই। সীমান্তের কাটাতারের বেড়া পেরিয়ে এরা কখনো কখনো বাংলাদেশে যায়, তো খাবারের সন্ধানে আবার এদেশে চলে আসে। কাটাতারের বেড়া ভেঙ্গে নিজেরাই নিজেদের যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করে নিয়েছে। বি-এস-এফ-রাও এদের যাতায়াতে বাধা দেয় না।  এই ক বছর আগেও সেখানে  একটি পুরুষ সমেত আটটি হাতি ছিল। কে বা কারা দলের ঐ একমাত্র পুরুষ হাতিটিকে মেরে ফেললো, তার সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় নি! তবে মনে করা হচ্ছে,  ওর ঐ  মৃত্যুটা প্রতিশোধের শিকার (retaliation killing)। বেঁচে থাকা বাকি স্ত্রী হাতিদের মধ্যে ২০১৭ সালে মেদলি চা বাগানে একটা বিদ্যুৎ সম্পৃক্ত হয়ে, ২০১৮ সালে আরেকটা শরীরে ঘা হয়ে মারা যায়।  বর্তমানে হারাধনের মাত্র পাঁচটি ছানাই রয়েছে। হ্যাঁ,  আবারো বলছি, সবকটি ছানাই স্ত্রী। যেহেতু দলে পুরুষ নেই, তাই  কমতে কমতে একদিন এরা হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে, বরাক উপত্যকা থেকে বুনো হাতির দল... চিরতরে...
এই বিষয়টাই বৈজ্ঞানিক (তথা সংরক্ষনবাদীদের) মহলে তুলে ধরার জন্য প্রয়াস করেছিলাম। Journal of Threatened Taxa নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল, ২০১৮/১৯ সালে সমাদৃতও হয়েছে যথেষ্ট।  গবেষণা পত্রখানার নির্যাস দেশ-বিদেশের প্রায় ছ’খানা সংবাদ পত্রে বেরিয়েছিল। রাজস্থানের জনৈক ভদ্রলোক ( Ashok Choudhary)  দি হিন্দু পত্রিকায় খবরটি পড়ে উনার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একটা পোস্ট কার্ড পাঠালেন  হিন্দিতে তিনি লিখেছেন
আদরণীয় প্র. পার্থঙ্করজী,
সাদর নমস্কার The Hindu মে Transboundary conservation মে 06 হাথিও কে সমুহ কে বারে মে পড়না বহুত রুচি বর্ধক লগা আসাম ও বাংলাদেশ মে সময় সময় পর  ইনকা জান, ইনকা স্বভাব বিচারণীয় হ্যাঁয় প্রকৃতি ও বন্য জীব কিসি Human boundary মে নেহি রহতি হ্যাঁয় য়ে ইনকা উদাহরন হ্যাঁয় Article য়ে  The journal of threatened Taxa মে প্রকাশিত আপকে আলেখ কা ভি সন্দেশ হ্যাঁয় ইয়হ আলেখ হামে নই দিশা, নয়া বিচার দেতা হ্যাঁয়  Transboundary Conservation পর হমে আজ বিচার ও কামকরনা  আবশ্যক হ্যাঁয় হমারে ইয়হা ভি  Great Indian Bustard কে সম্বন্ধ মে ইয়হ  কারগর স্থাবিত হ শকতা হ্যাঁয় Transboundary Conservation পর আধারিত আপকা Article বহুত প্রেরক হ্যাঁয় আপ কো বহুত বহুত ধন্যবাদ শুভ কামনাএ… Ashok Choudhary, (33, Sindhi Muslim Basti, Mazuria, Jodhpur, Rajasthan 342003)
প্রশস্তি পত্র পেয়েছি ঠিকই কিন্তু এদের বাঁচানোর জন্যও আজ পর্যন্ত তেমন কিছু একটা করে উঠতে পারি নি বিষয়টা নিয়ে অধ্যাপক আর সুকুমার (Elephant Man of India) এর সঙ্গেও  সাক্ষাতে কথা বলেছি, কিন্তু  কিছু হিল্লে হয়ে উঠে নি…!
দেখা যাক এর পর রাজ্যের বন ও পরিবেশ দপ্তর যদি কিছু একটা সদর্থক ভূমিকা নেয়!!

(২) পলিথিন কাসুন্দি

পলিথিন বা ‘ক্যারি-ব্যাগ’ ব্যবহারের উপর কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, দেশজুড়ে, রাজ্যজুড়ে, এমন কি জেলা জুড়েও।  সেটা তো এই কদিন আগের কথা। রাস্ট্রসঙ্ঘের পরিবেশ মন্ত্রকের কার্যালয় (UNEP)  থেকে ২০১৮ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের শ্লোগান ছিল, ‘সে নো টু প্লাস্টিক’... সেদিনটা, অর্থাৎ ৫ই জুন, ২০১৮  দল-মত / ধনী-গরিব/ পন্ডিত- মূর্খ নির্বিশেষে আমরা এক দিনের জন্য হলেও অল্প বিস্তর প্লাস্তিক ব্যবহারের কুফল অনুভব করেছিলাম, এবং তা ব্যবহার বন্ধ করা উচিত, সেরকম অমায়িক বক্তব্য দিয়েছিলাম, মাইক হাতে নিয়ে। এর পর পর যেই কে সেই...
স্বচ্ছতা হি সেবা’, ‘স্বচ্ছ-ভারত’, সে নো টু অয়ান টাইম প্লাস্টিক’, ‘ প্লাস্টিক ফ্রি নেশনইত্যাদি ইত্যাদি শ্লোগান অল্প-বিস্তর আমরা দূরদর্শন, রেডিও, পত্র-পত্রিকা এবং অন্যান্য বিজ্ঞাপন মারফত শুনেছি এবং শিখেছি যদিও, কিন্তু তার সিকি ভাগও আদতে রপ্ত করতে পেরেছি কি না তা পাঠক মহলের বিচার্য ২০১৯এর স্বাধীনতা দিবসের  ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর দেশবাসীর উদ্দেশ্যে গোটা দেশে প্লাস্টিক বর্জনের যে আবেদন জানিয়েছিলেন, তা কার্যকর করতে গিয়ে রাজ্য এবং জেলা প্রশাসনিক স্তরে মাস খানেক কিছু সরকারি অনুষ্ঠান এবং পত্র-পত্রিকায়  পরদিন সেসব অনুষ্ঠানের সচিত্র প্রতিবেদন ছাড়া, বাস্তবে ফলপ্রসূ করা যেতে পারে সেরকম দীর্ঘ মেয়াদি কি কি পদক্ষেপই হাতে নেওয়া হয়েছে, তা আপনা দের অজানা নয়!  
১৫ই আগস্ট, ২০১৯-এ প্রধান মন্ত্রীর প্রদত্ত ভাসনের সুত্র ধরে ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধমে পর্যায় ক্রমে দেশজুড়ে স্বচ্ছতার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে, ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ১লা অক্টোবর সহর এবং গ্রামে জন সচেতনতা সভা, আবর্জনা সংগ্রহ, আবর্জনা ধ্বংস করা, জায়গায় জায়গায় শ্রমদান কর্মসূচি, দ্বিতীয় পর্যায়ে, অর্থাৎ, ২রা অক্টোবর প্লাস্টিক সংগ্রহ এবং বর্জ্য পদার্থ পৃথকীকরণের জন্য গোটা দেশজুড়ে শ্রমদান, এবং তৃতীয় পর্যায়ে, ৩রা অক্টোবর থেকে ২৭শে অক্টোবর পর্যন্ত প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করা এবং বর্জ্য প্লাস্টিক সমূহ ভালো উপায়ে বিনষ্ট করা। এই তৃতীয় পর্যায়ের ২৫ দিনের মধ্যে প্রথম পাঁচদিন (অর্থাৎ ৩ -৭ অক্টোবর) দেশের ৭৮,০০০ ওয়ার্ড এবং ৬ লক্ষ গ্রাম থেকে সংগৃহীত আবর্জনা শহর এবং জেলার সংগ্রহণ কেন্দ্রে নিয়ে আসার কথা; পরের দু দিন (অর্থাৎ ৮-১০ অক্টোবর) পুনর্নবীকরন যোগ্য এবং পুনর্নবীকরন অযোগ্য, এই দুই ভাগে ভাগ করা, আর এর পরের ১৭ দিন (অর্থাৎ ১১-২৭ অক্টোবর) পুনর্নবীকরন যোগ্য প্লাস্টিক গুলোকে কারখানায় স্থানান্তরিত করা, যাতে করে এগুলো সড়ক নির্মাণ ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করা যায়।
ব্যক্তিগত তৎপরতায় গোটা দেশ তথা বিশ্ব এটাও দেখতে পেল যে ১২ অক্টোবর, ২০১৯ তামিলনাডুর মামালাপূরম সমুদ্র তটেদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে থেকে প্লাস্টিক-সামগ্রী  এবং অনান্য আবর্জনা সংগ্রহ করছেন, যা নিঃসন্দেহে সবার কাছেই একটি বার্তা বহন করে। ২রা অক্টোবর, ২০১৯, অর্থাৎ বাপুজির জন্মদিনটা থেকে আমরা, অর্থাৎ আপামর ভারতবাসী স্বচ্ছতার মন্ত্রে দীক্ষা নিলামঘরে-বাইরে, হাটে-ঘাটে, মাঠে-বাজারে, মন্দিরে-মসজিদে, সভা-সমিতিতে সর্বত্র এটাই স্থির করা হয় যে, এখন থেকে আর প্লাস্টিক নয়। তার বিকল্পে হোক অন্য কিছুর ব্যবহার। কথা এমনটাই ছিল। দেশের জনক-এর নামে  উনার জন্মদিনে নেওয়া সপথ গুলো কতটা আন্তরিক ভাবে পালন করেছি, তার কি কোনও পরিসংখ্যান রয়েছে? অন্ততঃ এই উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্য গুলোতে? এবং পৃথক ভাবে বরাক উপত্যকার তিন জেলায়?
ঐসব হম্বি-তম্বি দেখে আশা করা যাচ্ছিল, হয়তঃ এবার কিছু একটা হলে হতেও পারে! কিন্তু না! হয়নি! ‘কেউ কথা রাখে নি’! আমরাও না…! সাময়িক ভাবে কিছু অন্য রকমের বিকল্প কেরি-ব্যাগ বাজারে এসেছিল যদিও, দশ-পনেরো দিনের জন্য হলেও  আম-জনতা একটু একটু করে বিকল্প ভাবতে শুরু করে ছিলেন যদিও, কিন্তু প্লাস্টিক ব্যবসায়ীর আকুল আবেদনে, ২রা অক্টোবর, ২০১৯ অব্ধি প্লাস্টিক ব্যবহারের উপর সাময়িক ভাবে নিষেধাজ্ঞা মৌখিক ভাবে রদ করা হল, এবং তার পরের ঘটনাগুলোর জন্য আমাদের নিত্যদিন ব্যবহ্ত এক জোড়া চোখ সাক্ষী দেদার পরিমান প্লাস্টিক আজকের দিনে হাটেবাজারে বেপরোয়া ভাবে ব্যবহ্ত হচ্ছে ‘ক্যারি-ব্যাগ’ বানিজ্য তো আর পাঁচটা শিল্পের মতই মুনাফাদায়ী, এবং এর পেছনে লগ্নী কৃত ধনরাশির পরিমাণটাও যে  একেবারে নগন্য নয়! কিন্তু, তবুও একটা কথা থেকেই যায়! প্লাস্টিক বর্জনের এই আহ্বান তো  গোটা দেশজুড়েই, দ্বীপ সদৃশ বরাক উপত্যকার জন্যও যে শুধুমাত্র এই সমস্যা তা তো নয়! তাহলে? শরণার্থী সুলভ মানসিকতার এ যেন এক জাজ্বল্য উদাহরন!  

() গুয়াহাটিতে কাছাড়ী উল্লুক

ব্রহ্মাপুত্র উপত্যকা এবং বাংলাদেশের কিছু এলাকা ছাড়া  পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না এমন প্রজাতির বানর ( হুক্কু বানর, বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এদের নাম, Hoolock hoolock ) বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রোজকান্দি চা বাগানের পিছনের জঙ্গলে রয়েছে। ঘন জঙ্গল ছাড়া এরা বাস করতে পারে না, কারন গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালেই এরা ঘুরে বেড়ায়।  হাত দিয়েই যেহেতু এক গাছ থেকে অন্য গাছে যায়, তাই ইংরেজিতে এদেরকে ‘Brachiators’ বলা হয়। এরা কক্ষনো মাটিতে নামতে পারে না। যেহেতু এরা এক গাছ থেকে অন্য গাছে যায়, তাই অরণ্যে গাছের ঘনত্ব কমে যাওয়াটা এদের জন্য অশনি সঙ্কেত। অনৈতিক বৃক্ষছেদন দেশ তথা পৃথিবীর অন্যত্র দেদার চলছে। রোজকান্দি চা বাগানের পিছনের জঙ্গলের অংশটুকুও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
সালটা ২০১৬। এই প্রজাতির বানরের উপর গবেষণা করছিলেন এক গবেষক। এক সন্ধ্যায় খবর পাওয়া গেল, একটি স্ত্রী হলুক গাছ থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক জখম হয়েছে। ঘটনা স্থলে গিয়ে দেখা গেলো, তিরিশ ফুট উঁচু একটা গাছ থেকে অন্য গাছে লাফ দিয়ে যেতে চাইছিল, স্ত্রী বানরটি। যেহেতু, মধ্যের জায়গাটা ফাঁকা, তাই যেতে পারে নি, ফস্কে পড়ে গেছে মাটিতে, এবং এর পরই মহা বিপত্তি। হাত পা কোমরে প্রচণ্ড চোট, খাওয়া দাওয়া সব কিছু বন্ধ হয়ে সে প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী।
দুর্লভ প্রজাতির বানরের এই অবস্থা দেখে চারদিকের সব সংরক্ষণ কর্মীদের সাথে যোগাযোগ করা হল। আর এতে বিশেষ লাভও হল বৈ কি! গুয়াহাটি চিড়িয়াখানা থেকে ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মোহন লাল স্মিথ বিমানে করে ছুটে এলেন, একে বাঁচানোর জন্য। একদিন শিলচরে থেকে, প্রাথমিক চিকিৎসার পর বানরটিকে নিয়ে বিশেষ একটা গাড়ি দিয়ে গুয়াহাটি খানাপাড়া ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে এক্স-রে, সনোগ্রাফি ইত্যাদি সবই হল। সপ্তাহ খানেক হাসপাতাল থাকার পর সে সুস্থ হয়ে উঠল। এরপর একে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল  গুয়াহাটি চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানার বর্তমান দ্বায়িত্বে থাকা ডি এফ ও, শ্রী তেজস মেরিস্বামি-র সঙ্গে সেদিন কথা বলে জানা গেলো, এখনও গুয়াহাটি চিড়িয়াখানায় স্ত্রী হলুকটি রয়েছে এবং সুস্থই আছে। সময়োচিত তৎপরতায় দুর্লভ প্রাণীটিকে বাঁচাতে পারার আনন্দই আলাদা।